২৫ শে মার্চ, অপারেশন সার্চলাইট। সেই গভীর কালোরাতের ভয়াবহতা স্পষ্টভাবে ঠিক কতজন জানি আমরা? সত্যিই কজন জানেন সেটা জানতে হলে হয়ত আমাদের সার্চলাইট হাতে নিয়েই বের হতে হবে তাদের খুঁজতে। একটু পর্যবেক্ষণ বা আলোচনা করলেই চোখে পড়ে ইতিহাস সম্পর্কে এই প্রজন্মের উদাসিনতা। আর এই উদাসিনতাই সত্যকে ঢেকে রেখেছে কালো ছায়ায়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত
‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পরিচিত পূর্ব পরিকল্পিত গণহত্যার মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চে বাঙালির জাতীয়তাবাদী, স্বাধিকার আন্দোলনকে সশস্ত্র হামলার দ্বারা দমন করতে চেয়েছিল পাকিস্তানি শাসকগণ । আর আজ উদাসীন হয়ে আমরা জাতীয়তাবাদী চেতনাকে বিসর্জন দিচ্ছি নিজের অজান্তেই।
১৯৭০ এর নভেম্বরে সংঘটিত ‘অপারেশন ব্লিটজ’-এর পরবর্তী সামরিক আক্রমণ ছিল এই কালোরাতের গণহত্যা যা পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের আদেশে পরিচালিত৷ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সব বড় বড় শহর দখল করে নেয়া এবং রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধীদের এক মাসের ভেতর নিশ্চিহ্ন করে দেয়াই ছিল পাকিস্তানি সামরিক অপারেশনের আসল উদ্দেশ্য। বাঙালি যখন তার অধিকারকে আঁকড়ে ধরেছিলো, বর্বর পাকিস্তানীরা তখনই বুঝতে পেরেছিলো কোনোকিছু দিয়েই এই জাতিকে দমিয়ে রাখা যাবে না। তাই একাত্তরের সেই রাতে শুরু করে জঘন্যতম গণহত্যা। ২৫ মার্চের যে প্রস্তুতি নিয়েছিলো পশ্চিম পাকিস্তান, তা ছিলো খুবই গোপনীয়। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা, বাঙালি সামরিক সেনাসহ কারও মাঝে যাতে সন্দেহ তৈরি না হয় সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছিলো তারা।
শহরমুখী সেনাবাহিনীর মেকানিক্যাল কলামটি প্রথম প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় ফার্মগেইটে। সেখানে বড় বড় গাছের গুঁড়ি, অকেজো স্টিম রোলার এবং ভাঙা গাড়ির স্তূপ জমিয়ে রাখা হয়েছিল পথ আটকানোর জন্য। মুক্তিকামী বেপরোয়া প্রতিরোধোন্মুখ জনতার মাঝ থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উঠছিল।রাত ১১টা ২০ মিনিটের মধ্যেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি অংশ রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের চারিদিকে অবস্থান নিতে শুরু করে। এ আক্রমণের সংবাদ তাৎক্ষণিকভাবে সারাদেশের জেলা ও সাব ডিভিশনে বেতার বার্তার মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয়।রাত সাড়ে ১১টার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অধিনায়ক কর্নেল তাজের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাদের কনভয় রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আক্রমণ শুরু করে।ব্যারাকে অবস্থানরত বাঙালি পুলিশ সদস্যরা সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে পাল্টা গুলি করে।
একই সময়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২২তম বালুচ রেজিমেন্টের সেনারা পিলখানায় ইপিআর-এর ওপর হামলা করে। ব্যারাকে থাকা বাঙালি সেনারা চরম সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন।পিলখানা ইপিআর ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনস আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাঁখারি বাজারসহ সমগ্র ঢাকাতে শুরু হয় প্রচণ্ড আক্রমণ; বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় রাতের অন্ধকারে গুলি, বোমা আর ট্যাংকের আওয়াজে প্রকম্পতি পুরো শহর।
সেনাবাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, শিক্ষকদের আবাসিক এলাকা, এবং বস্তিবাসীর ওপর নজিরবিহীন নৃশংসতা চালায়।রাত ১টার পর পাকিস্তানের সেনারা ট্যাংক আর সাঁজোয়া যান নিয়ে ধানমণ্ডির বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। অনেকেই আত্মগোপনে যেতে বললেও বঙ্গবন্ধু যাননি।তিনি বলেছিলেন, “আমাকে না পেলে ওরা ঢাকা জ্বালিয়ে দেবে।”বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তার সম্পর্কে বিবিসির একটি প্রতিবেদনে সৈয়দ বদরুল আহসান রচিত ‘ফ্রম রেবেল টু ফাউন্ডিং ফাদার’ বইকে উদ্ধৃত করা হয়েছে।
তবে এই গণহত্যার বিপরীতে বাঙালিরা যে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তুলবে তা ভাবতে পারেনি শোষকরা। অস্ত্র-সস্ত্র আর ক্ষমতা দিয়ে তারা যে গণহত্যা শুরু করেছিলো তারই প্রতিবাদে বাঙালি ঘোষণা করে স্বাধীনতা। পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ। এ দেশের জমিন রক্তস্রোতে ভেসে আমারা উপহার পেয়েছি বারুদবিহীন নির্মল আকাশ বাতাস। এই জমিনে আজো লেগে আছে রক্তের দাগ। সেই দাগ সম্পর্কে অজ্ঞতা কিংবা জেনেও দাগের উপর দিয়ে উদাসীন হেঁটে যাওয়া অকৃতজ্ঞতার সামিল। যেটুকু কালো ছায়া রয়ে গেছে আজো সে ছায়া দূর হোক উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হোক চারদিক।
লেখক:কপোতাক্ষী নূপুরমা সিঞ্চি
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

