বৈশ্বিক খাদ্য সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন এমন সব উদ্যোগ যা কম বিনিয়োগে, কম পরিচর্যায়, দ্রুততম সময়ে খাদ্যের জোগান দেবে। এসব কথা মাথায় রেখে শরীয়তপুর জেলা প্রশাসন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আশ্রায়ন প্রকল্পগুলোয় পায়রা পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে জেলার জেলাপ্রশাসক জনাব মোঃ পারভেজ হাসানের স্ব-উদ্যোগে সদর উপজেলার বুড়িরহাট আশ্রায়ন প্রকল্পের প্রতিটি বাড়িতে পাঁচ/ছয়জোড়া পায়রা পালনের উপযুক্ত কাঠের খোপ ও দুই জোড়া করে প্রজননক্ষম পায়রা প্রদান করা হয়েছে।
খোপগুলো বিশেষভাবে তৈরি করে বিশেষ স্থানে স্থাপন করা হয়েছে যেন তা ঝড়ঝাপটা ও বৃষ্টির পানি থেকে সুরক্ষিত থাকে। উদ্যোগটি বাস্তবায়নে কার্যকর সহায়তা প্রদানসহ সার্বক্ষণিক তদারকি করেছেন সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব জ্যোতি বিকাশ চন্দ্র। পর্যায়ক্রমে এটি গোটা জেলায় বিস্তৃত করা হবে। নানাবিধ স্থানিক সুবিধার জন্য শরীয়তপুর জেলা পায়রা পালনের জন্য বেশ উপযুক্ত বলে প্রমাণিত। এই জেলায় প্রচুর খাদ্যশস্য উৎপাদন হয় যার যৎসামান্য অংশ পায়রার খাবার জোগাতে যথেষ্ট। পক্ষান্তরে পায়রা ক্ষেতের ক্ষতিকর পোকা মাকড় খেয়ে ফসলের উপকারও করে থাকে।
একই সাথে জেলাপ্রশাসক আশ্রায়ন প্রকল্পগুলোর পাশের রাস্তার দুই ধারে উচ্চফলনশীল জাম্বো ঘাসের চাষের উদ্যোগ নিয়েছেন যার বীজ পায়রার অতি প্রিয় খাদ্য। এভাবে পায়রা পালন হতে পারে এই এলাকার জন্য আর্থসামাজিক উন্নয়নে একটি টেকসই উপায়। পায়রার অসুখ বিসুখ রোধে টিকা দান ও ওষুধ সরবরাহের জন্য প্রাণিসম্পদ বিভাগকেও সম্পৃক্ত করা হয়েছে। কবুতর পালন করে আশ্রায়ন প্রকল্পগুলোর অধিবাসীদের বেকারত্ব দূর, আত্মকর্মসংস্থান, বাড়তি আয় ও দারিদ্র্য বিমোচন হবে বলে জেলা প্রশাসন আশাবাদী।
পোল্ট্রির মধ্যে পায়রার বৈশিষ্ট্য ভিন্ন রকম। কবুতরের মাংস স্বাস্থ্যের জন্য কতটা উপকারী, তা হয়তো জানা নেই অনেকেরই। আকারে ছোট হলেও কবুতরের মাংসে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন আছে, যা গরুর মাংসের কাছাকাছি। এতে থাকা প্রোটিনের মান ১০০ গ্রামে ১৭.৫ গ্রাম, যা গরুর মাংসের কাছাকাছি ১০০ গ্রামে ১৮.৮ গ্রাম। এমনকি এতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানও বেশি থাকে মুরগির মাংসের চেয়ে। একটি কবুতরের মাংসে আয়রন, ফসফরাস, ভিটামিন বি ১২ থাকে।এসব উপাদান আমাদের মস্তিষ্ক ও ত্বকের স্বাস্থ্যের পাশাপাশি রক্ত সঞ্চালনকেও উন্নত করে। আবার কবুতরের মাংস দ্রুত রান্নাও করা যায়।
চলুন জেনে নেওয়া যাক কবুতরের মাংস খাওয়ার উপকারিতাসমূহ-কবুতরের মাংসে থাকা প্রোটিন শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর পাশাপাশি বিপাক ক্রিয়া উন্নত হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, চুল ও নখের স্বাস্থ্য ভালো থাকে, শরীর আরও এনজাইম তৈরি করতে পারে ফলে ক্লান্তি কমে। কবুতরের মাংসে উচ্চ খনিজ উপাদান আছে। বিভিন্ন খনিজগুলোরর মধ্যে অন্যতম হলো সেলেনিয়াম। যা ফ্রি র্যাডিক্যাল থেকে আমাদের শরীরকে রক্ষা করে, থাইরয়েডের কার্যকারিতা বাড়ায়, রিউম্যাটিড আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি কমায়, পেশি ব্যথা কমায়, ত্বক ও চুলের বিবর্ণতা রোধ করে।
ক্যানসার ও হৃদরোগের ঝুঁকিও কমে নিয়মিত কবুতরের মাংস খেলে। কবুতরের মাংসে যথেষ্ট পরিমাণ জিঙ্ক থাকে। যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, আঁচিলের মতো চর্মরোগ প্রতিরোধ করে, কোষ বৃদ্ধি সমর্থন করে, দ্রুত ক্ষত নিরাময় করে, গন্ধের অনুভূতি বাড়াতে, রক্তে শর্করার মাত্রা ও ক্ষুধা কমাতে, বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে, বিষণ্নতা কমায় ও শিশুদের বিকাশ উন্নত করে। কবুতরের মাংস আমাদের অঙ্গ ও রক্তের জন্যও ভালো। এর উচ্চ প্রোটিন ও খনিজ লিভার ও কিডনির কার্যকারিতা উন্নত করে, স্মৃতি ও বুদ্ধি বাড়ায়, রক্তচাপ কমানো, ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ করে। কবুতরের মাংস ছাড়াও এর লিভার ও হাড়েও অনেক উপকারিতা আছে।
কবুতরের লিভারে কোলিন থাকে যা শরীরে ভালো কোলেস্টেরলেল পরিমাণ বাড়ায় ও এথেরোস্ক্লেরোসিস প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে (একটি রোগ যাতে আপনার ধমনীতে ফলক তৈরি হয়)।এই পাখির হাড়ের মধ্যে এমন একটি পদার্থ আছে যা ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায় ও রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে।
কবুতর প্রাচীনকাল থেকে পত্রবাহক ও শখ হিসেবে পালন করলেও এখন বাণিজ্যিকভাবে পালন করা হয়। অন্য পোল্ট্রির চেয়ে কবুতর পালনে পুঁজি কম লাগে, ঝুঁকি কম, পালন সহজ ও লাভ বেশি। পৃথিবীতে ১২০ জাতের কবুতর পাওয়া যায়। এর মধ্যে বাংলাদেশে ২০ প্রকার রয়েছে। এক জোড়া কবুতর থেকে বছরে ১২ জোড়া বাচ্চা পাওয়া যায়। যার দাম ৩০০০ টাকা। কবুতরের বাচ্চা (২৮-৩০দিন) ও বড় কবুতরের চাহিদা ও দাম বেশি।
কবুতর পালনে খরচ কম। কবুতর বাইরের খাবারই বেশি খায়। বাসস্থান খরচ কম। জায়গা কম লাগে। অতিরিক্ত জমি বা জায়গার প্রয়োজন হয় না। বাড়ির আঙিনা, দালানের ছাদে, বারান্দায়, বেলকোনি ও সানশেডে পালন করা যায়। অতিরিক্ত শ্রমিকও লাগে না। কাজের অবসরে পালন করা যায়। কবুতর মাত্র ৪-৫ মাস বয়সে ডিম দেয়া শুরু করে। ১০- ১২ বছর বাঁচে। কবুতরের মাংস সুস্বাদু ও রোগীদের পথ্য। কবুতর পালন সহজ বলে ছাত্রছাত্রী, দুঃস্থ মহিলাসহ সব পেশার মানুষ পালন করতে পারে। কবুতরের বিষ্ঠা জৈবসার হিসেবে জমিতে ব্যবহার করা যায়। পুঁজি কম লাগে, দ্রুত বিনিয়োগ ফেরত পাওয়া যায়। কবুতরের রোগবালাই কম হয়। ১৮ দিনে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। কবুতর পালন আনন্দদায়ক। অনেকে শখ করে পালন করে।
কবুতরের পালক শিল্প কারখানায় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয়। কবুতর উচ্ছিষ্ট খাদ্য ও পোকামাকড় খেয়ে বাড়িঘর পরিষ্কার রাখে। এক হিসেবে দেখা গেছে, ৩০ জোড়া উন্নত জাতের কবুতর পালন করে প্রায় এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করে প্রথম বছর প্রায় ৮০ হাজার টাকার বাচ্চা বিক্রি করা যায়। দেশি জাতের ৩০ জোড়া কবুতর পালন করলে ৬০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে প্রথম বছর ৫০ হাজার টাকার বাচ্চা বিক্রি করা যায়। সবকিছুর বিবেচনায় ঘরে ঘরে পায়রা পালন দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি বৈশ্বিক খাদ্য সংকট এর অভিঘাত মোকাবিলায় জোরালো সহায়তা প্রদান করবে বলে আশা করাই যায়।

