রাজনীতি সব সময় একটা টাটকা খোরাকের গল্প। এর উত্তাপ কখনো শেষ হয়ে যায় না। আগামী বছরের এক দম শেষ সূর্য ঢলে যাওয়ার প্রাক্কালে অনুষ্ঠিত হতে পারে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে সেটাও নির্ভর করছে পরিস্থিতির উপর, অতীতের ইতিহাস মশৃন নয়, সামরিক শাসন, সেনা সমর্থিত ওয়ান ইলেভেনের সময়কাল তারই জলন্ত উদাহরণ। নির্বাচন ব্যবস্থা স্বাধীনতার এতকাল পরেও একটা স্থায়ী ভিত্তির ওপর গড়ে তুলতে না পারা হলো বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দল আর শাসক শ্রেণির ব্যর্থতা। প্রত্যেকেই নিজস্ব সুযোগ সুবিধার কথা বিবেচনা করে নির্বাচন ব্যবস্থা সাজিয়ে নেয় বলে রাজনৈতিক বিরোধের আশঙ্কা লেগেই আছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। তত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান পদে বসাবে বলে ততকালীন বিচারকদের বয়স বৃদ্ধি করা হয় বলে, আওয়ামী লীগের এই অভিযোগ নতুন নয়। তত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে একসাথে রাজপথ দখল, সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে নব্বই এর আন্দোলনে এরশাদের পতনের পর মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পেরেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দলের যখন প্রধান উদ্দেশ্য ক্ষমতায় আরোহন করা, আর দুঃখ জনক হলেও সত্যি এই ক্ষমতার অতি লোভের আগুনে পড়ে তিক্ততা চরম আকার ধারণ করেছে। যার ফলশ্রুতিতে এক এগারোর সামরিক ছায়া শাসক দেশের হাল ধরলে সেই সময় সাধারণ মানুষ উচ্ছ্বাসে গ্রহণ করে নেয়। হুট করে সারাদেশের অফিস আদালতে গায়েবি ভাবে ঘুষ দূর্নীতি বন্ধ হয়ে যায়। টেবিলের উপর ফাইল নড়াতে আর টাকার দরকার ছিলো না বলে অল্পতেই বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে সেই মঈন এর সরকার। রাজনীতিবিদ রা আতংকিত হয়ে পড়ে, বিদেশে পাড়ি জমায় অনেক কালো টাকার মালিক। সেই ইতিহাস সবার ই টাটকা স্মৃতি। আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক যুদ্ধ অপরাধীদের বিচার, বিচারকের টেলিফোন আলাপ ফাঁস, সাক্ষী সুখবলি রঞ্জনের অপহরণের ঘটনা বাংলাদেশ সরকারের জন্য সুখকর স্মৃতি হয়ে উঠেনি। রাষ্ট্রাপক্ষের আইনজীবীর ঘুষ দূর্নীতি আর দেশের অন্যতম কুরআনের মুফাসসির মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ফাসীর রায়ের ফলে সারাদেশের উত্তাল রাজনীতির বলি প্রায় শতাধিক নিরীহ মানুষের জীবন চলে যাওয়ার মতো ঘটনা বাংলাদেশকে অনেক খানি নাড়িয়ে দেয়। জামায়াতের নির্বাচনের নিবন্ধন বাতিল কিন্তু জামায়াত কে নিষিদ্ধ না করা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশল চাল যে ছিলো তা সময়ের সাথে সাথে পরিস্কার হয়ে উঠে। তার চেয়ে রাজনৈতিক মামলার পাহাড় চাপিয়ে দিয়ে বিরোধী পক্ষ কে দমিয়ে রাখার জন্য চেষ্টা কে, রাজনৈতিক অপচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরার জন্য মানুষের কাছে নিজেদেরকে তুলে ধরাই আবশ্যিক হয়ে উঠে বিরোধী শিবিরের। যার ফলশ্রুতিতে দেশের ক্রান্তিকালীন বিপদ যেমন, বিডিআর বিদ্রোহ, বন্যা, মহামারী কিংবা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের আশ্রয় দেওয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা করার মতো অতীব গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার নিবারনে সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের সাথে এক টেবিলে বসার মতো পরিবেশ তৈরি হয়নি কখনো। পক্ষান্তরে জাতীয় পার্টির সাথে ক্ষমতার ভাগ বাটোয়ারা করে (জাতীয় পার্টির নেতাদের বক্তব্য মতো) ক্ষমতায় হিস্যা কষে থাকায় সংসদ দীর্ঘদিন যাবত অকার্যকর হয়ে থাকায় সমালোচনা বা জনগণের উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা কার্যত ধংস হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে সরকারের মেগা প্রকল্প, কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের লুটপাট, শেয়ার বাজারের লোপাট, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বালিশ তোলার মতো ক্ষুদ্র কেনাকানা সহ অজস্র অজস্র দূর্নীতির বিরুদ্ধে একটা শক্তিশালী প্রতিবাদ আমরা বিরোধী দলের থেকে পাইনি।
তবে সবচেয়ে যে বিষয় নিয়ে না বললেই নয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল যে তত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে রাজপথ দখল করে ফেলেছিল সেই দলের ইউ টার্ন হয়ে আদালতের কাধে ভর করে সেই ব্যবস্থা বাতিলের ফলে চূড়ান্ত রাজনৈতিক সংকট থেকে পরিত্রাণ পাওয়া দূরহ হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক দলের একগুঁয়ে স্বঘোষিত দাবী, ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আক্রমণ, বেগম খালেদা জিয়া, তারেক জিয়ার দন্ড ইত্যাদি কারণে রাজনৈতিক সমঝোতা দিন দিন আরও জটিল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
রাজনৈতিক দলের সহনশীলতা আর অপরের প্রতি দরদ না থাকলে দেশের অগ্রগতি কখনো কোন দেশে সম্ভব নয়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কিংবা পাকিস্তানের ক্রান্তিলগ্নে সকল দলের এক টেবিলে বসার সুন্দর ছবি আমাদের মনে কখনো উদিত হয় না বলেই এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সহজ হচ্ছে না।
গত ২০১৪ সালের আওয়ামী লীগের একক নির্বাচন, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিনা ভোটে সংসদ সদস্য হওয়া, আর গত নির্বাচনের আগের রাতে ভোট হওয়ার অভিযোগ নিয়ে কথার শেষ নেই এমনকি সরকারের শরিক জাতীয় পার্টির চীফ নেতারা কিংবা নির্বাচন কমিশনের প্রধান যখন স্বীকার করে অবলীলায় তখন আর বলার কিছুই থাকে না।
এই অগোছালো, সরকারি দলের সংবিধানের দোহাই দেয়া কিংবা বি এন পির র সরকারের অধীনে নির্বাচন না করার ঘোষণার এই টালমাটাল অবস্থায় নির্বাচনের রোডম্যাপ জারী হয়েছে কোন কিছুর সমাধা না করেই। ইতোমধ্যে বি এন পির মিটিং মিছিলের মতো সারাদেশের উপজেলা, জেলা আর মহানগরীর আনাচে-কানাচে কর্মসূচি চলছে। পুলিশ তার স্বভাব সূলভ আচরণ বদলাতে পারেনি বলে মিছিলের উপর গুলি চালিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় চার জনের লাশ পড়েছে। ছাত্রলীগের আর যুবলীগের প্রধান নেতারা ঘোষণা দিয়েই বসেছে যে তারা অগোছালো, জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন, নেতা হীন দলকে রাজপথ দখল করতে দিবে না। গত কয়েক দিন আগে বি এন পির শান্তিপুর্ন মোমবাতি প্রজ্বালন প্রোগামে তাবিত আউয়াল, সেলিমা রহমানের মতো বড় মাপের নেতাদের উপর অতর্কিত হামলা চালিয়েছে সরকারি দলের লোকজন। কিন্তু বি এন পির দাবী তাদের আত্মরক্ষার অধিকার আইনে বলা আছে বিধায়, পতাকায় বাশের লাঠি বেধে মিছিল করতে বাধ্য হচ্ছে তারা।
সরকারের আর বিরোধী দলের চোখে এই আন্দোলন টিকে থাকার। ক্ষমতায় আসতে না পারলে দেশ থেকে দেড় লাখ আওয়ামী লীগের মানুষ জনকে দেশ থেকে পালাতে হবে বলে, ওবায়দুল কাদেরের অগ্রীম সতর্কতা আর সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীলঙ্কার পরিনতি ভাবনায় ফেলেছে তাদের। বি এন পির ও ভাবনা আগামী সরকারে তারা না থাকলে একই অবস্থা কিংবা জেল জুলুমের শিকার হতে পারে আরো অধিক হারে। এমনিতেই প্রায় লক্ষাধিক মামলায় জড়িয়ে আছে।
কাজেই রাজনৈতিক দলের হাতে আর বসে থাকার সময় নেই। প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন ও। ইভিএম নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দেয়া ইভিএম বিরোধী মতামত কিভাবে নির্বাচন কমিশন পালটে দিল তাতে রাজনৈতিক আলোচনায় নির্বাচন কমিশন নতুন বিতর্ক জন্ম দিয়েছে একেবারে প্রথম পরীক্ষায়। তবুও থেমে নেই রোডম্যাপ সংলাপ, চায়ের দাওয়াত, আট হাজার কোটি টাকায় অর্থনৈতিক এই বিপর্যয়ের মধ্যে ইভিএম ক্রয়ের চাহিদা পত্র বেশ মরার উপর খাড়ার ঘা। এই নিয়মিত আয়োজন গত কয়েকটি নির্বাচনে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। বিরোধী পক্ষের থেকে এটাকে বলা হয় রুটিন ওয়ার্ক। আর সরকারী দলের সোজা কথা নির্বাচন কমিশন সবসময়ই স্বাধীন।
বিরোধী শিবিরের জোট মেরামত, ভাগ বাটোয়ারা, সরকারি দলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ, রাজনৈতিক সমীকরণ মেলানোর চেষ্টায় ব্যতিব্যস্ত বিরোধী শিবিরের। তবুও সবচেয়ে সংকট হচ্ছে জনগণের উপর আস্থা হারানো। যার ফলে রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় না থাকলে অস্তিত্বের চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। তবে কেন এই আতংক তাহলে সবার, নাকি প্রত্যেকের ঝুলিতে আছে এক গাদা দুর্নীতি, লুটপাট, অপশাসন আর অপরাধ। জনগণ সব কিছু জানে, কাজেই তাদের রায়ের উপর অপেক্ষা করতে হবে। তাহলে গনতন্ত্র সরল পথে হাটবে।
লেখক: লতিফুর রহমান প্রামাণিক, আইনজীবী।

