সর্বকালের সেরা মানব প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে জানা আমাদের সকলের প্রয়োজন। তাই এই পবিত্র রমজান মাসে আমাদের মুক্তকণ্ঠের পাঠকদের জন্যে আমাদের পক্ষ থেকে ছোট্ট এই প্রচেষ্টা, সীরাতে রাসূলে আকরাম (সা.)। আজকে থাকছে এই বিশেষ আয়োজনের দ্বিতীয় পর্ব। সম্পূর্ণ লিখাটি সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র)এর “সীরাতে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম” থেকে সংগ্রহ করে পরিমার্জিত করা হয়েছে।
মানবতার সুবহে সাদিক ও মহানবী (সা:)র নবুয়ত লাভ
মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নবুয়ত লাভের মুহূর্ত যত ঘনিয়ে আসছিল ততই তাঁর মেযাজে নির্জনতা ও নিঃসঙ্গ জীবনের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তিনি অধিকাংশ সময় ছাতু ও পানি নিয়ে শহর থেকে কয়েক ক্রোশ দূরে হেরা নামক পর্বতের এক নির্জন গুহায় চলে যেতেন এবং সেখানে আল্লাহর ইবাদত করতেন। এই ইবাদতে আল্লাহর যিকরও শামিল ছিল, শামিল ছিল আল্লাহর অপার কুদরতের প্রতি ধ্যান-জ্ঞানও। যতদিন ছাতু ও পানি নিঃশেষ না হয়ে যেতো ততদিন তিনি নগরীতে ফিরে আসতেন না। এ সময় তিনি প্রায় স্বপ্ন দেখতেন। রাতের বেলা যেই স্বপ্ন দেখতেন দিনের বেলা তা সত্য হয়ে দেখা দিত।
একদিন তিনি নিত্য দিনের ন্যায় হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন। এমন সময় তিনি সামনে একজন ফেরেশতা দেখতে পেলেন। ফেরেশতা তাঁকে লক্ষ করে বললেন, আপনি পড়ুন । তিনি বললেন, আমি পড়তে জানি না । ফেরেশতা তখন মহানবী (সা:)কে বুকের সঙ্গে এমনভাবে জাপটে ধরলেন যে, তাঁর জান বেরিয়ে যাবার উপক্রম হলো। এরপর তিনি তাঁকে ছেড়ে দিলেন এবং বললেন, পড়ুন । মহানবী (সা:) বললেন, আমি পড়তে জানি না । ফেরেশতা আবার সর্বশক্তি দিয়ে মহানবী (সা:)কে জাপটে ধরলেন। এরপর ছেড়ে দিলেন এবং বললেন, এবার পড়ুন। তিনি আবার বললেন, আমি পাঠক নই, আমি পড়তে জানি না । ফেরেশতা আবার সর্বশক্তি সহযোগে মহানবী (সা:)কে জাপটে ধরলেন। এরপর ছেড়ে দিলেন এবং বললেন, পড়ুনঃ
بسم الله الرحمن الرحيم
اِقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ – خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ – اِقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَم – عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَالَمْ يَعْلَمُ –
‘পরম দাতা ও করুণাময় আল্লাহর নামে’
“পাঠ কর তোমার প্রভু প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাক থেকে। পাঠ কর, আর তোমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না” ।[সূরা ‘আলাক : ১- ৫ আয়াত]
এই ঘটনার পর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সাথে সাথে ঘরে ফিরে আসেন এবং শয্যায় আশ্রয় নেন। তিনি তাঁর স্ত্রী বিবি খাদীজাতুল কুবরা (রা:)কে বললেন, আমাকে কাপড় দিয়ে ঢেকে দাও। এরপর তিনি যখন কিছুটা সুস্থ বোধ করলেন তখন খাদিজা (রা:)কে বললেন, আমি এমন এক ঘটনা দেখতে পাচ্ছি যে, ভয় পেয়ে গেছি । আমি জীবনের আশংকাবোধ করছি। খাদীজাতুল কুবরা (রা:) নবী করীম (সা:)কে অভয় বাণী ও সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, না, আপনার ভয় পাবার কিছু নেই । আমি দেখেছি, আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, সত্য বলেন, ইয়াতীম বিধবা ও অসহায় দুঃস্থদের সাহায্য করেন, মেহমানদারী করেন, বিপদগ্রস্তদের সমবেদনা জানান । আল্লাহ কখনোই আপনাকে বিপদে ফেলবেন না, লাঞ্ছিত করবেন না ।
এরপর হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রা:) নিজেও চিত্তের প্রশান্তি লাভের প্রয়োজন অনুভব করলেন। তিনি নবী করীম (সা:)কে সাথে নিয়ে তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফলের কাছে গেলেন । ওয়ারাকা হিব্রু ভাষা জানতেন এবং তিনি তাওরাত ও ইনজীল সম্পর্কে অভিজ্ঞ পণ্ডিত ছিলেন। হযরত খাদীজা (রা:)র অনুরোধে নবী করীম (সা:) ওয়ারাকার সামনে হেরা গুহায় ফেরেশতা জিবরাঈল (আ) আগমনের বৃত্তান্তসহ যাবতীয় ঘটনার আনুপূর্বিক বর্ণনা দিলেন। ওয়ারাকা এই ঘটনা শুনতেই বলে উঠলেন, ইনিতো সেই যিনি মূসা (আ)র কাছে এসেছিলেন। হায়! আমি যদি যুবক হতাম। হায়! আমি যদি ততদিন বেঁচে থাকতাম যখন আপনার কওম আপনাকে দেশ থেকে বের করে দেবে। একথা শুনে মহানবী রাসূলুল্লাহ (সা:) বললেন, আমার কওম কি আমাকে বের করে দেবে? ওয়ারাকা বললেন, হ্যাঁ, এর আগে দুনিয়াতে যাঁরাই আপনার ন্যায় এরূপ বাণী পেয়েছেন সূচনাতেই তাঁদেরকে এরূপ শত্রুতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। হায়! আমি যদি সেদিন পর্যন্ত জীবিত থাকি তবে আমি আপনাকে সাহায্য করব।“
এরপর একদিন ফেরেশতা জিবরাঈল (আ) নবী করীম (সা:)এর খেদমতে এসে তাঁকে পাহাড়ের পাদদেশে নিয়ে গেলেন। তিনি নবী করীম (সা:)এর সামনে নিজে ওযূ করলেন । মহানবী (সা:) নিজেও ওযূ করলেন। এরপর উভয়ে একত্রে নামায পড়লেন। ফেরেশতা জিবরাঈল (আ) এতে ইমামতি করেন ।
ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগ
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ইসলামের প্রচার শুরু করে দিলেন । বিবি খাদীজা (রা:), আলী (পিতৃব্য পুত্র, বয়স আট বছর), আবু বকর (বন্ধু), যায়দ ইবনে হারিছা (মুক্ত দাস) প্রথম দিনেই ইসলাম কবুল করে মুসলমান হয়ে যান । এই সব ব্যক্তির ঈমান আনা, যাঁরা মহানবী (সা:)র চল্লিশ বছরের জীবনের খুঁটিনাটি বিষয় থেকে শুরু করে সকল বিষয়েই অবহিত ছিলেন। এর কয়েক দিন পরই বেলাল, ওমর ইবনে আমবাসা ও খালিদ ইবনে সাঈদ মুসলমান হয়ে যান। আবু বকর (রা:) ছিলেন বিরাট ধনী মানুষ। তিনি ব্যবসা করতেন। মক্কায় তাঁর দোকান-পাট ছিল।
লোকের সাথে তাঁর খুবই মেলামেশা ছিল, ছিল ঘনিষ্ঠ অন্তরঙ্গতা। তাঁর প্রচারে হযরত উছমান গনী, যুবায়র ইবনুল আওয়াম ও তালহা, সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা:) মুসলমান হন । এরপর আবু উবায়দা ইবনুল জার্রাহ, পরবর্তীতে যাঁর উপাধি হয়েছিল আমীনুল-উম্মাহ, আবদুল আসাদ ইবনে বেলাল, উছমান ইবনে মাজঊন, আমের ইবনে ফুহায়রা ইদী, আবু হুযায়ফা ইবনে উতবা, সায়েব ইবনে উছমান ইবনে মাজঊন ও আরকাম মুসলমান হন। উম্মুল মুমিনীন খাদীজাতুল-কুবরা (রা:)র পর মহিলাদের মধ্যে হযরতের চাচা আব্বাসের স্ত্রী উম্মুল-ফযল, আসমা বিনতে ‘উমায়স, আসমা বিনতে আবু বকর ও ওমর ফারুকের বোন ফাতেমা (রা:) ইসলাম কবুল করেন।
এ সময় মুসলমানরা পাহাড়ের গুহায় গিয়ে লুকিয়ে নামায পড়তেন ৷ একবার নবী করীম (সা:) হযরত আলী (রা:)কে সাথে নিয়ে কোন গিরিগুহায় নামায পড়ছিলেন। এমন সময় সেখানে পিতৃব্য আবু তালিব হঠাৎ করেই এসে উপস্থিত হন। তিনি তাঁদের এই নতুন পন্থায় ইবাদতরত দেখতে পেয়ে বিস্মিত হন। সেখানেই তিনি দাঁড়িয়ে পড়েন এবং গভীরভাবে তা নিরীক্ষণ করতে থাকেন। নামায শেষ হতেই তিনি ভ্রাতুষ্পুত্রকে জিজ্ঞেস করেন, এ কোন্ ধর্ম যা তুমি অনুসরণ করছ? উত্তরে নবী করীম (সা:) জানান, এটাই আমাদের পূর্বপুরুষ ইবরাহীম (আ)-এর ধর্ম। আবু তালিব বলেন, আমি যদিও এই ধর্ম এখতিয়ার করতে পারছি না, তবে তোমাদের অনুমতি রয়েছে, আর এ ব্যাপারে কেউ তোমাদের প্রতিবন্ধকতা করতে পারবে না।
অতঃপর তিন বছর যাবত নবী করীম (সা:) অত্যন্ত সংগোপনে ইসলামের তাবলীগী দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এখন রিসালতের প্রদীপ্ত সূর্য অনেক ঊর্ধ্বে বিরাজ করছে। তাই পরিষ্কার নির্দেশ ঘোষিত হলো, তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছ তা প্রকাশ্যে প্রচার কর ৷ অধিকন্তু আরও নির্দেশ এল, আর এটা তোমার নিকটাত্মীয়বর্গকে সতর্ক করে দাও ।
একদিন তিনি হযরত আলী (রা:)কে ডেকে বললেন দাওয়াতের আয়োজন করতে। প্রকৃতপক্ষে ইসলামের প্রচারের এটাই ছিল প্রথম সুযোগ। আবদুল মুত্তালিবের বংশের সকলকে দাওয়াত দেওয়া হলো । দাওয়াতী মাহফিলে হামযা, আবু তালিব, আব্বাস সকলেই শরীক ছিলেন। নবী করীম (সা:) খাওয়া-দাওয়ার পর দাঁড়িয়ে সকলকে লক্ষ করে বললেন যে, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে সেই জিনিস নিয়ে এসেছি যা দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য যথেষ্ট। এই ভার বহনে কে আমাকে সাহায্য করবে, সঙ্গী হবে? সমগ্র মাহফিল পিন-পতন নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেল। অকস্মাৎ মাহফিলের এক কোণ থেকে হযরত আলী (রা:) উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, যদিও আমার চোখে বিঘ্ন, ঠ্যাংগুলো সরু ও পাতলা আর আমার বয়স যদিও কম, তবুও আমি আপনাকে সহযোগিতা করব, সঙ্গী হব, সাথী হব । কুরাইশদের জন্য এ ছিল এক বিস্ময়কর দৃশ্য যে, দু’জন মানুষ (যাঁদের একজন তের বছর বয়সের কিশোর) দুনিয়ার ভাগ্যের ফয়সালা করছে । উপস্থিত সকলেই তাঁর কথা শুনে (বিদ্রূপের হাসি) হেসে ফেলল । কিন্তু পরবর্তীতে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, উচ্চারিত শব্দের প্রতিটি হরফ সত্য ছিল, এর এক বিন্দুও মিথ্যা কিংবা অতিশয়োক্তি ছিল না ।
একদিন নবী করীম (সা:) সাফা পর্বতের ওপর আরোহণ পূর্বক` লোকদের ডাকতে শুরু করলেন। ডাক শুনে যখন সকলেই পর্বতের পাদদেশে জমায়েত হলো তখন নবী করীম (সা:) বললেন, তোমরাই বল, তোমরা আমাকে সত্যবাদী বলে মনে কর নাকি মিথ্যাবাদী? সকলেই সমস্বরে উত্তর দিল, আমরা আজ পর্যন্ত তোমার মুখ থেকে কোনরূপ মিথ্যা কিংবা বাজে কথা বলতে শুনি নি । আমরা তো তোমাকে সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত বলেই জানি । তখন নবী করীম (সা:) বললেন, দেখ, আমি পর্বতের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছি আর তোমরা আছ এর পাদদেশে। আমি পর্বতের এপাশ-ওপাশ দু’পাশই দেখতে পাচ্ছি। আমি যদি বলি, একদল সশস্ত্র লোক মক্কায় তোমাদের ওপর হামলা করবার জন্য অপেক্ষা করছে, তাহলে কি তোমরা তা বিশ্বাস করবে? লোকেরা বলল, হ্যাঁ, বিশ্বাস করব। কেননা তোমার মত সত্যবাদী লোককে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করার কোনই কারণ নেই, বিশেষত তুমি যখন উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে এবং পর্বতের উভয় পার্শ্বই দেখতে পাচ্ছ। নবী করীম (সা:) বললেন, এতক্ষণে আমি যা বললাম তা ছিল একটি দৃষ্টান্ত যা তোমাদের বোঝাবার জন্য বলেছি।
এখন তোমরা নিশ্চিত জেনে রাখ, মৃত্যু তোমাদের মাথার ওপর নেমে আসছে এবং তোমাদের সবাইকে আল্লাহর সামনে হাজির হতে হবে। আর আমি মৃত্যু পরবর্তী জগত সেভাবে দেখছি যেভাবে তোমরা দুনিয়াটা দেখছ। নবী করীম (সা:)এর এই চিত্তাকর্ষক ও হৃদয়গ্রাহী ওয়াজের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, নবুয়তের জন্য তিনি এমন একটা দৃষ্টান্ত পেশ করবেন, কিভাবে একজন মানুষ পরলৌকিক জগত দেখতে পারে যেখানে হাজারও মানুষ তা দেখতে পারে না। নেমে এল কাফির-মুশরিকদের জুলুম-নির্যাতনের স্টীম রোলার। তবে ইতোমধ্যে মুসলমানদের একটা নির্ভরযোগ্য সংখ্যক লোকের জামা’আত তৈরী হয়ে গিয়েছিল যাদের সংখ্যা চল্লিশের বেশি ছিল। একদিন নবী করীম (সা:) কা’বা শরীফে গিয়ে আল্লাহর ওয়াহদানিয়াতের ঘোষণা দিলেন। কাফিরদের কাছে এটা ছিল হারাম শরীফের সবচেয়ে বড় অবমাননা। সেজন্য হঠাৎ করেই সেখানে হৈ হট্টগোল শুরু হয়ে গেল এবং চতুর্দিক থেকে লোকে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল । হযরত খাদীজা (রা:)র প্রথম স্বামীর ঔরসজাত পুত্র হারিছ ইব্ন আবী হালা (রা:) খবর মিলতেই ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে পড়েন এবং হারাম শরীফে গিয়ে নবী করীম (সা:)কে বাঁচাতে প্রয়াস পান। কিন্তু চতুর্দিক থেকে উত্থিত তলোয়ারের আঘাতে কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি শাহাদত লাভ করেন । ইসলামের রাস্তায় এটাই ছিল প্রথম রক্ত যা দ্বারা মক্কার যমীন রঞ্জিত হয়েছিল ।
এরপর নবী করীম (সা:) সবাইকে সাধারণভাবে বোঝাতে শুরু করলেন। প্রতিটি মেলায়, প্রতিটি গলি-ঘুপচি ও পথে-প্রান্তরে যাকে যেখানে পেতেন সেখানে গিয়ে আল্লাহর ওয়াহদানিয়াতের সৌন্দর্য ও গুণাবলী তার সামনে তুলে ধরতেন । মূর্তি পূজা, পাথর পূজা ও বৃক্ষ পূজা থেকে মানুষকে ফেরাতে চেষ্টা করতেন। তিনি মানুষকে বোঝাতেন, তারা যেন আল্লাহ্ তাআলার পবিত্র সত্তাকে সকল প্রকার ক্ষয়-ক্ষতি, দোষ-ঘাট ও অপবিত্রতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র ভাবে। তারা যেন এই বিশ্বাস রাখে, আসমান-যমীন, চাঁদ-সূর্য, ছোট-বড় সব কিছুই আল্লাহর সৃষ্টি । তিনিই এসব সৃষ্টি করেছেন। সব কিছুই তাঁর মুহতাজ, তাঁর মুখাপেক্ষী। দো’আ কবুল করা, রোগীকে রোগমুক্ত করা, তাকে সুস্থতা দান করা, মানুষের সকল চাহিদা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা সবই আল্লাহর এখতিয়ারে। আল্লাহর হুকুমের বাইরে কেউ কিছু করতে পারে না ।
আরবে উকায, উয়ায়না ও যিল মাজায নামক মেলা ছিল বিখ্যাত। দূর-দূরান্তের এলাকা থেকে মানুষ এসব মেলায় যোগ দিত। নবী করীম (সা:) সে সব মেলায় গমন করতেন এবং আগত লোকদের মধ্যে ইসলামের প্রচার করতেন এবং তাওহীদের দাওয়াত দিতেন।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যখন দাওয়াতের ঘোষণা দেন এবং মূর্তি পূজার প্রকাশ্য নিন্দাবাদ করতে শুরু করেন তখন কুরাইশদের কতিপয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি আবু তালিবের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করে । আবু তালিব নম্র ভাষায় তাদের বুঝিয়ে-সুজিয়ে বিদায় দেন। কিন্তু বিবাদের মূল বিষয় বহাল থাকায় অর্থাৎ মহানবী (সা:) আপন দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন থেকে বিরত না হওয়ায় উক্ত প্রতিনিধিদল পুনরায় আবু তালিবের সমীপে হাজির হয়। এই দলে সকল কুরাইশ নেতাই অর্থাৎ ওত্ত্বা ইবনে রবীআ, শায়বা ইবনে রবীআ, আবু সুফিয়ান, আস ইবনে হিকাম, আবু জেহেল, ওলীদ ইবনে মুগীরা, আস ইবনে ওয়াইল প্রমুখ শরীক ছিল। তারা আবু তালিবকে বলল, তোমাদের ভাতিজা আমাদের উপাস্য দেব-দেবীর অবমাননা করে, আমাদের বাপ-দাদাদেরকে পথভ্রষ্ট ও গোমরাহ বলে এবং আমাদেরকে বোকা ঠাওরায়। অতএব, হয় তুমি আমাদের মাঝখান থেকে সরে যাও অথবা তুমিও ময়দানে নেমে পড় যাতে আমাদের উভয়ের মাঝে একটা চূড়ান্ত ফয়সালা হয়ে যায়। আবু তালিব দেখতে পেলেন, অবস্থা এখন বড়ই নাযুক হয়ে গেছে ৷ কুরাইশরা আর সহ্য করতে চায় না । আর আমিও একাকী কুরাইশদের মুকাবিলা করতে পারব না। তিনি তখন মহানবী (সা:) কে ডেকে বললেন, ভাতিজা! আমার ওপর এতটা বোঝা চাপিও না যা আমি বইতে পারব না ।
রাসূলুল্লাহ (সা:)র বাহ্যিক পৃষ্ঠপোষক যা ছিলেন এক মাত্র আবু তালিবই ছিলেন। তিনি এবার কষ্ট অনুভব করলেন ৷ অশ্রুভারাক্রান্ত কণ্ঠে তিনি চাচাকে বললেন, আল্লাহর কসম! এরা যদি আমার এক হাতে সূর্য আর এক হাতে চন্দ্র এনে দেয়, তবুও আমি আমার দায়িত্ব পালনে ক্ষান্ত হব না। হয় এ কাজ করতে গিয়ে আমি শেষ হয়ে যাব অথবা আল্লাহ পাক আমাকে সফল করবেন । রাসূল আকরাম (সা:)এর এই প্রভাবমণ্ডিত কথা আবু তালিবকে খুবই প্রভাবিত করে। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা:)কে কাছে ডেকে বলেছিলেন, যাও, নিজের কাজ কর গিয়ে। কেউ তোমার একটা পশমও বাঁকা করতে পারবে না।
মহানবী (সা:) নিয়ম মাফিক ইসলামের দাওয়াত প্রদানের কাজে নিয়োজিত রইলেন। কুরাইশরা যদিও মহানবী (সা:)কে হত্যার কথা চিন্তা করতে পারল না কিন্তু তিনি যাতে এ কাজ না করতে পারেন সেজন্য তাঁকে বিভিন্ন রকমের কষ্ট দিতে লাগল । তারা পথে কাঁটা বিছাত । নামায পড়তে গেলে ময়লা-আবর্জনা তাঁর শরীরের ওপর এনে ফেলত । এছাড়া কটুকাটব্য ও গালি-গালাজ করত।
.আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনি’ল -আস (রা:) তাঁর স্বচক্ষে দেখা একটি ঘটনার বর্ণনা দেন, “একদিন মহানবী (সা:) কা’বা শরীফে নামায পড়ছিলেন । এমন সময় উকবা ইবন আবী মুঈত এসে হাজির হলো । সে তার চাদর পাকিয়ে রশির ন্যায় বানাল । এরপর রাসূলুল্লাহ (সা:) সিজদায় যেতেই সে রশির ন্যায় চাদরটি হুযূর সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের গলায় ফাস আকারে ফেলে মোচড়ের পর মোচড় দিতে লাগল । ফলে ফাসের কারণে রাসূলুল্লাহ (সা:)র দম বন্ধ হবার উপক্রম হলো। এতদ্সত্ত্বেও হুযূর আকরাম (সা:) পরিপূর্ণ প্রশান্তির সঙ্গে সিজদায় পড়ে থাকলেন । ইতোমধ্যে খবর পেয়ে হযরত আবু বকর দৌড়ে আসেন, ধাক্কা দিয়ে উকবাকে সরিয়ে দেন এবং নিম্নোক্ত আয়াত তেলাওয়াত করেন,
وقد جاءكم بالبينات . الله اتقتلون رجلا ان يقول ربي
‘তোমরা কি এমন একজন মানুষকে হত্যা করবে যিনি বলেন, আমার প্রভু-প্রতিপালক আল্লাহ ও তিনি তোমাদের কাছে উজ্জ্বল দলীল-প্রমাণসহ আগমন করেছেন?’ এ সময় কয়েকজন দুষ্ট প্রকৃতির লোক হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা:)এর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাঁকে বেদম প্রহার করে ।”
আরেক দিনের ঘটনা। মহানবী (সা:) কা’বা শরীফে নামায পড়ছেন ৷ কুরাইশরাও কা’বা প্রাঙ্গণে গিয়ে বসল। এদের মধ্যে আবু জেহেলও ছিল। সে বলল, আজ শহরে অমুক জায়গায় উট যবাই করা হয়েছে। উটের নাড়ি-ভুঁড়ি এদিক সেদিক পড়ে আছে। কেউ গিয়ে সেগুলো নিয়ে এসো এবং মুহাম্মদের মাথার ওপর চাপিয়ে দাও । হতভাগা উকবা উঠে দাঁড়াল এবং গিয়ে সেগুলো নিয়ে এল । এরপর মহানবী (সা:) সিজদায় যেতেই তাঁর পিঠের ওপর চাপিয়ে দিল। হুযূর আকরাম (সা:) তখন তাঁর পরম প্রভুর ধ্যানে মত্ত। তিনি এর কিছুই জানতে পারেন নি । শয়তানগুলো মহানবী (সা:)এর এই দৃশ্যে উল্লাসে মেতে উঠল এবং একজন আরেক জনের গায়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল। সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু কাফিরদের সংখ্যা বেশী থাকায় তিনি সামনে এগুতে সাহস পাননি। এমন সময় মা’সূম সাইয়েদা ফাতেমা (রা:) এসে হাজির হন এবং পিতার পিঠের ওপর থেকে আবর্জনা সরিয়ে পিতাকে মুক্ত করেন । কাফিরদের এই ঘৃণ্য কাজের জন্য তিনি তাদের ভর্ৎসনাও করেন।
একবার কুরাইশ কাফিরদের একটি বৈঠক বসে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মক্কায় আগত লোকদের মহানবী (সা:)র থেকে দূরে রাখার নিমিত্ত কৌশল খুঁজে বের করা। একজন বলল, আমরা বলব যে, সে একজন গণক। অতএব, কেউ যেন তাঁর পাশে না যায় । একথা শুনে প্রবীণ কুরাইশ নেতা ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা বলল, আমি বহু গণক দেখেছি। গণকের কথার সঙ্গে মুহাম্মদের কথার আদৌ মিল নেই । না, একথা বলা যাবে না। কেননা এতে করে আরবের বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা আমাদেরকে মিথ্যাবাদী ঠাওরাবে। একজন বলল, আমরা মুহাম্মদকে পাগল বলব। ওয়ালীদ পুনরায় বলল, মুহাম্মদের সঙ্গে পাগলামীর সম্পর্ক কী? একজন প্রস্তাব করল, মুহাম্মদকে কবি বলা যাক । ওয়ালীদ এ প্রস্তাবও সরাসরি এই বলে প্রত্যাখ্যান করল, কাব্য-কবিতা কাকে বলে তা আমরা জানি । মুহাম্মদের কথার সাথে কবিতা বা কাব্যের আদৌ কোন সাদৃশ্য নেই, নেই কোন সামঞ্জস্য । এরপর আরেক জন প্রস্তাব করল, তবে তাঁকে যাদুকর বলা হোক। ওয়ালীদ প্রত্যুত্তরে জানাল, মুহাম্মদ যেরূপ পবিত্র, পরিচ্ছন্ন ও সুরুচিপূর্ণ পরিবেশে থাকেন, যাদুকরদের ভেতর তুমি তা কোথায় পাবে? যাদুকরদের যেই অলুক্ষণে চেহারা-সূরত, যেই পূতিগন্ধময় অভ্যাস তা আরেক জগতের কথাই মনে করিয়ে দেয়। এর সঙ্গে মুহাম্মদের মিল কোথায়? এবার সবাই হার মেনে তাকেই ধরে বসল, তাহলে চাচা, আপনিই বলুন যে, এখন আমরা কি করব? কি করা উচিত? ওয়ালীদ তখন বলল, আসলে সত্য বলতে কি, মুহাম্মদের কথার ভেতর আজীব ধরনের মিষ্টতা আছে। তাঁর কথাবার্তাই এক অপরূপ স্বাদের ৷ হ্যাঁ, আমরা বরং এই বলতে পারি, তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত কথার প্রতিক্রিয়া এমন যার ফলে পিতা থেকে পুত্র, ভাই থেকে ভাই ও স্বামী থেকে স্ত্রী পৃথক ও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ৷ এজন্য তাঁকে আমাদের এড়িয়ে চলা উচিত। সকলেই ওয়ালীদের এই কথা এক বাক্যে সমর্থন করল। এর পর থেকে তারা মক্কা থেকে বহির্গামী সড়কগুলোর মোড়ে মোড়ে আসন গেড়ে বসল। কোন নবাগত পথিক ও মুসাফির দেখলেই তাকে ঘিরে ধরত এবং রাসূলুল্লাহ (সা:)র কাছে না যাবার জন্য সতর্ক করত ও ভয় দেখাত।
মহানবী (সা:)র সঙ্গে ওৎবার আলোচনা
মক্কার কাফিররা যখন দেখতে পেল, মুহাম্মদ (সা:) কোনক্রমেই দাওয়াত ও তবলীগ ছাড়ছেন না এবং তিনি তা ছাড়তে ইচ্ছুকও নন, তখন তারা পরামর্শ করল, চল, আমরা মুহাম্মদকে প্রথমে লোভ দেখাই। তাতেও যদিও কাজ না হয় তাহলে তাঁকে ধমক লাগাব। আশা করি এতেই কাজ হবে ৷ মক্কার বিখ্যাত সর্দার ওৎবা একথা শুনে বলে উঠল, দেখ। আমি তাঁর কাছে যাচ্ছি এবং এর একটা নিষ্পত্তি করে আসছি। এই বলে সে রাসূলুল্লাহ (সা:)এর কাছে গেল এবং বলল:
“মুহাম্মদ, ভাতিজা আমার! যদি তুমি তোমার এ সব কর্মকাণ্ড দ্বারা ধন-সম্পদ জমা করতে চাও তাহলে মিছেমিছি অনর্থ সৃষ্টি করে লাভ কী? আমরা নিজেরাই এত ধন-সম্পদ জমা করে তোমাকে দিচ্ছি যে,তুমি সবচেয়ে বড় ধনী হয়ে যাবে ৷ আর যদি সম্মানের ভিখারী হও তাহলে তাও বল, আমরা তোমাকে আমাদের সকলের নেতা হিসেবে বরণ করে নিচ্ছি। আর যদি রাজত্বের আকাঙ্ক্ষী হও তাহলে আমরা তোমাকে আরবের বাদশাহ বানিয়ে দিই । তুমি যা চাও তাই পাবে ৷ কেবল শর্ত একটাই, তুমি তোমার এ সব পথ ছেড়ে দাও। আর হ্যাঁ, যদি তোমার মাথায় কোন গোলমাল দেখা দিয়ে থাকে তাহলে তাও বল, আমরা তোমরা চিকিৎসা করাই।
মহানবী (সা:) এতক্ষণ চুপ করে ওৎবার কথা শুনছিলেন। ওৎবা থামতেই তিনি বললেনঃ এতক্ষণ তুমি আমার সম্পর্কে যা বললে তার একটিও ঠিক নয়। ধন- সম্পদ, মান-সম্মান কোনো কিছুই আমার প্রয়োজন নেই । আর আমার মাথায়ও কোন গোলমাল নেই। আমি কি চাই তা কুরআন করীমের নিম্নোক্ত বাণী শুনলেই তুমি জানতে পারবে। এরপর তিনি সূরা হা-মীম আস-সাজদা থেকে তেলাওয়াত করলেন:
لم – تَنْزِيلٌ مِّنَ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ – كِتَبُ فَصَلَتْ أَيْتُهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا
القوم يعلمُونَ – بَشِيرًا وَنَذِيرًا – فَأَعْرَضَ أَكْثَرُهُمْ فَهُمْ لَا يَسْمَعُونَ –
وقالوا قلوبُنَانِى اَكِنَة مَا تَدْعُونَا إِلَيْهِ وَفِي أَذَانِنَا وَقُرُو مِن بَيْنِنَا
وبينك حِجَابٌ فَاعْمَلُ إِنَّنَا عَمِلُونَ – قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى
الى انما الهم إلى وَاحِدٌ فَاسْتَقِيمُوا إِلَيْهِ وَاسْتَغْفِرُوهُ – وَوَيْلٌ
المشركين – الَّذِينَ لَا يَؤْتُونَ الزَّكَوةَ وَهُمْ بِالْآخِرَةِ هُمْ كَفِرُونَ – إِنَّ
الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الطَّلِطتِ لَهُمْ أَجْرٌ غَيْرُ مَمْنُون –
“হা-মীম; এটা দয়াময় পরম দয়ালুর নিকট হতে অবতীর্ণ। এটা এক কিতাব বিশদভাবে বিবৃত হয়েছে এর আয়াতসমূহ আরবী ভাষায় কুরআনরূপে, জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে; কিন্তু ওদের অধিকাংশই বিমুখ হয়েছে। সুতরাং ওরা শুনবে না। ওরা বলে, “তুমি যার প্রতি আমাদেরকে আহ্বান করছ সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণে আচ্ছাদিত, কানে আছে বধিরতা এবং তোমার ও আমাদের মধ্যে আছে অন্তরাল। সুতরাং তুমি তোমার কাজ কর এবং আমরা আমাদের কাজ করি’ । বল, “আমি তো তোমাদের মতই একজন মানুষ, আমার প্রতি ওহী হয় যে, তোমাদের ইলাহ্ একমাত্র ইলাহ্ । অতএব, তাঁরই পথ দৃঢ়ভাবে অবলম্বন কর এবং তাঁরই নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর’। দুর্ভোগ মুশরিকদের জন্য যারা যাকাত দেয় না এবং ওরা আখিরাতেও অবিশ্বাসী । যারা ঈমান আনে এবং সৎ কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার” । [১-৮ আয়াত]
কালাম পাক শুনতেই ওৎবার ওপর এক ধরনের মোহিনী শক্তি আচ্ছন্ন করে ফেলল৷ সে হাতের ওপর ভর করে ঘাড় পেছনে দিয়ে শুনতে লাগল এবং শেষ পর্যন্ত চুপচাপ উঠে চলে গেল। ওৎবা যখন ফিরে গেল তখন আর সেই আগের ওৎবা ছিল না। কুরাইশ সর্দাররাও যখন দেখতে পেল তখন বলল, দেখ, এখান থেকে যাবার সময় যেই চেহারা নিয়ে গিয়েছিল সেই চেহারা কিন্তু এখন তার নেই । তারা জিজ্ঞেস করল, তুমি কি দেখলে, কি শুনলে আর সে কী বলল? ওৎবা বলল, কুরাইশগণ! আমি এমন এক কালাম শুনে এসেছি যা না গণকের কথা, না কবির কাব্য । তা কোন যাদু-মন্ত্রও নয়। তোমরা আমার কথা শোন, মুহাম্মদকে তাঁর নিজের অবস্থার ওপর ছেড়ে দাও। লোকেরা ওৎবার কথা শুনে বলে উঠল, লে বাবা! মুহাম্মদের যাদু দেখি তোমাকেও কাবু করে ফেলেছে!
কুরাইশ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মহানবী (সা:)র আলোচনা
এই ব্যর্থতার পর কুরাইশরা পরামর্শ করল, মুহাম্মদকে কওমের সামনে ডেকে নিয়ে তাঁকে বোঝানো দরকার। পরামর্শের পর তারা মহানবী (সা:)এর কাছে খবর পাঠাল এই বলে যে, কুরাইশ নেতৃবৃন্দ আপনার অপেক্ষা করছেন । তারা আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান। নেতৃবৃন্দ কা’বার ভেতর সমবেত হয়েছেন। মহানবী (সা:) হৃষ্ট চিত্তে সেখানে গেলেন । কেননা কুরাইশ নেতৃবর্গ ঈমান আনুক এটাই ছিল তাঁর আন্তরিক অভিলাষ । মহানবী (সা:) সেখানে গিয়ে বসলে তারা এভাবে কথার সূত্রপাত করলঃ
“মুহাম্মদ! কথা বলার জন্য আমরা তোমাকে এখানে ডেকেছি। আল্লাহর কসম! আমরা জানি না এর আগে আর কেউ তার জাতির ওপর এত বড় বিপদ ডেকে এনেছে যতটা তুমি তোমার জাতির ওপর ডেকে এনেছ ৷ এমন কোন অমঙ্গল নেই যা তোমার কারণে আমাদের ওপর এসে পড়ে নি । এখন তুমিই বল, যদি তুমি এই নতুন ধর্মের মাধ্যমে বিত্ত-সম্পদ জমা করতে চাও তাহলে আমরা তোমার জন্য এত পরিমাণ সম্পদ জমা করে দেব যতটা সম্পদ আমাদের কারুর হাতেই নেই। আর যদি মান-সম্মান ও আভিজাত্য অর্জনের প্রত্যাশী হয়ে থাক তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের নেতা ও সর্দার বানিয়ে দেই। আর যদি সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হতে চাও তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের “সম্রাট” বানিয়ে দিই। আর যদি তুমি মনে করো, তুমি যা দেখতে পাও তা কোন জিন্ন যা তোমার ওপর চেপে বসেছে তাহলে যাদুটোনার সাহায্যে তোমাকে সারিয়ে তুলবার জন্য যত টাকাই লাগুক, আমরা তোমার জন্য ব্যয় করব। আর তা না পারলে কওম তোমাকে মা‘যূর ভাববে।”
তাদের কথা শেষ হতে রাসূল আকরাম (সা:) বললেন, “তোমরা এতক্ষণ যা বললে তার সাথে আমার আদৌ সম্পর্ক নেই ৷ আমি যেই শিক্ষা ও তালীম নিয়ে এসেছি তা বিত্ত-সম্পদ কামনার জন্য নয়, নয় তা… পদমর্যাদা ও সাম্রাজ্য লাভের জন্য। আল্লাহ পাক তোমাদের প্রতি আমাকে রাসূল বানিয়ে পাঠিয়েছেন । আমার ওপর কিতাব নাযিল করেছেন। আমাকে সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী বানিয়েছেন। আমি আমার প্রতিপালকের পয়গাম তোমাদেরকে পৌছে দিয়েছি এবং খুব ভালভাবে বুঝিয়ে দিয়েছি ।এখন তোমরা যদি আমার পেশকৃত শিক্ষামালা ও তা’লীমাত গ্রহণ কর তাহলে তা তোমাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতের পুঁজি হবে। আর তোমরা যদি তা প্রত্যাখ্যান কর তাহলে আমি আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষা করব যে, তিনি আমার ও তোমাদের জন্য কী ফয়সালা পাঠান।”
কুরাইশ নেতৃবর্গ বলল, “আচ্ছা, মুহাম্মদ ! তুমি যদি আমাদের কথা নাই মান, তাহলে অন্তত একটা কথা আমাদের শোন। তোমার জানা আছে, কী কঠিন সংকট ও দুঃসহ অবস্থার ভেতর দিয়ে আমাদের সময় কাটে। পানির অভাব আমাদের প্রকট আর আমাদের দিন গুজরান হয় কঠিন সংকটের মধ্য দিয়ে। এখন তুমি তোমার আল্লাহর কাছে চাও যাতে তিনি এই সব পাহাড়-পর্বত আমাদের সামনে থেকে সরিয়ে দেন যাতে করে আমাদের শহর প্রান্তর উন্মুক্ত হয়ে যায়। এছাড়া আমাদের জন্য নদী- নালা বইয়ে দাও যেমনটি সিরিয়া ও ইরাকের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত। অধিকন্ত আমাদের বাপ-দাদাদেরকে জিন্দা করে দাও আর ঐ সব যিন্দার ভেতর আমাদের পূর্বপুরুষ কুসাঈ ইবন কিলাব যেন অবশ্যই থাকে। কেননা তিনি ছিলেন আমাদের সর্দার আর তিনি সব সময় সত্য কথা বলতেন ৷ আমরা তাকে তোমার ব্যাপারেও জিজ্ঞেস করব। যদি তিনি তোমার কথা সত্য বলে মেনে নেন আর তুমি আমাদের প্রার্থিত বস্তুগুলো দিয়ে দাও, চাহিদাগুলো পূরণ কর তাহলে আমরাও তোমাকে সত্য বলে মেনে নেব এবং এও মেনে নেব যে, আল্লাহর দরবারে তোমার একটা মর্যাদা আছে বটে! আর আসলেই তিনি তোমাকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন যেমনটি তুমি বলছ ।’ কুরাইশদের কথার প্রত্যুত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা:) বললেন, “আমি ও সব কাজের জন্য রাসূল হিসেবে প্রেরিত হইনি। আমি তো রাসূল হিসাবে প্রেরিত হয়েছি সেই তা’লীম তথা শিক্ষামালার নিমিত্ত আর আমি আল্লাহর পয়গাম তোমাদেরকে শুনিয়ে দিয়েছি। তোমরা যদি তা কবুল করে নাও তাহলে তোমাদের দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য তা পুঁজি হবে। আর তোমরা যদি তা প্রত্যাখ্যান কর তাহলে আমি আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষা করব। আমার ও তোমাদের ব্যাপারে যা ফয়সালা করবার তা তিনিই করবেন। কুরাইশ নেতৃবর্গ বললঃ “আচ্ছা, তুমি যদি আমাদের জন্য কিছুই না করতে চাও তাহলে স্বয়ং নিজের জন্যই তুমি আল্লাহর কাছে কিছু চাও, তিনি তোমার জন্য একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করে দিন যিনি বলবেন, এই লোক সত্যবাদী এবং তিনি আমাদেরকে তোমার বিরোধিতা করতে নিষেধ করে দেবেন। আর হ্যাঁ, তুমি এও চাও, তোমার জন্য এই মরুভূমির বুকে একটা বাগান যেন বানিয়ে দেওয়া হয় যার ভেতর বড় বড় প্রাসাদ থাকবে, যেই প্রাসাদে পুঞ্জীভূত স্বর্ণ-রৌপ্য থাকবে। এসবের তোমার প্রয়োজনও আছে ৷ “এখন পর্যন্ত তো তুমি নিজেই বাজারে যাও এবং নিজের রুটি-রুজির তালাশও তুমিই কর, তোমাকেই করতে হয়। এসব পাবার পরই কেবল আমরা তোমার প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব বুঝতে পারব এবং মেনে নেব।”
রাসূলুল্লাহ (সা:) বললেন, “আমি এমনটি করব না এবং আল্লাহর কাছেও কখনও এমনটি চাইব না। আর এজন্য আমাকে পাঠানোও হয় নি । আল্লাহ পাক আমাকে সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী হিসাবে পাঠিয়েছেন। তোমরা যদি আমাকে ও আমার কথাকে মেনে নাও তাহলে তোমাদের ইহকাল ও পরকাল ভাল হবে, কল্যাণ হবে। অন্যথায় আমি সবর করব, ধৈর্য ধারণ করব এবং আল্লাহর ফয়সালার অপেক্ষা করব।”
কুরাইশরা বললঃ আচ্ছা, তুমি তাহলে আসমান ভেঙে টুকরো করে এর একটি টুকরোই না হয় আমাদের ওপর ফেলে দাও ৷ কেননা তোমার ধারণা, আল্লাহ চাইলে এমনটি করতে পারেন। আর তুমি যতক্ষণ তা না করবে আমরা তোমার ওপর ঈমান আনব না । রাসূলুল্লাহ (সা:) বললেনঃ এমনটি করার এখতিয়ার একমাত্র আল্লাহর। তিনি চাইলে তা করতে পারেন । কুরাইশরা বললঃ মুহাম্মদ! এটা তো বল, তোমার আল্লাহ তোমাকে কি আগেই বলে দেয় নি, আমরা তোমাকে ডাকব, এ রকম সব প্রশ্ন করব, এসব জিনিস চাইব । আমাদের কথার এই জওয়াব হবে এবং আল্লাহর ইচ্ছা ও অভিপ্রায় এ ধরনের কিছু করার হতো ৷ তোমার আল্লাহ এমনটি করেননি। এজন্য আমরা মনে করি, যা কিছু আমরা শুনেছি তা ঠিকই শুনেছি। আমরা শুনেছি, ইয়ামামার ‘রহমান’ নামে একটি লোক থাকে আর সেই তোমাকে এ ধরনের কথা শেখায় ৷ আমরা কখখনো রহমানের ওপর ঈমান আনব না। দেখ, আজ আমরা আমাদের যাবতীয় ওযর-আপত্তির কথা তোমাকেই শুনিয়ে দিয়েছি। এখন আমরা কসম খেয়ে তোমাকে বলছি, আমরা তোমাকে এ ধরনের শিক্ষা ও তা’লীমের কখনো প্রচার করতে দেব না ৷ চাই কি এতে আমরাই মরি আর তুমিই মারা যাওঁ কুছ পরওয়া নেই) ৷ এ পর্যন্ত কথা হতেই তাদের ভেতর থেকে একজন বলে উঠল, “আমরা তো ফেরেশতাদের পূজো করি যারা আল্লাহর কন্যা।” আরেক জন্য ইতোমধ্যেই বলে উঠল: আমরা তোমার কথা বিশ্বাস করব না যতক্ষণ না তুমি আমাদের সামনে আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাদের নিয়ে আসছ ।
নবী (সা:) কুরাইশ নেতৃবর্গের কথা শেষ হতেই উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর দাঁড়াবার সাথে আবদুল্লাহ ইবন আবু মিয়্যা ইবন মুগীরাও দাঁড়িয়ে গেল। আবদুল্লাহ ছিল নবী করীম (সা:)এর ফুফাতো ভাই (আতেকা ইবন আবদুল মুত্তালিবের পুত্র)। সে বলল, মুহাম্মদ! দেখ তোমার কওম নিজেদের জন্য কিছু জিনিস চাইল। তুমি তা মানলে না। তারপর তারা চাইল, তুমি স্বয়ং নিজের জন্য এমন কিছু আলামত জাহির কর যদ্বারা তোমার সম্মান ও মর্যাদা প্রমাণিত হতে পারে। তুমি তাও কবুল করলে না। তারপর তারা নিজেদের জন্য অল্প বিস্তর আযাব চাইল যার ভয় তুমি দেখিয়ে থাক । তুমি তাও স্বীকার করলে না । ব্যস! এখন আর আমি তোমার ওপর কখনোই ঈমান আনব না, চাই কি তুমি সিঁড়ি বেয়ে আসমানেই চড়ে বস, আবার সিঁড়ি বেয়ে মাটিতেই নেমে আস। আর তোমার সাথে যদি চারজন ফেরেশতাও নেমে আসে এবং তারা তোমার সপক্ষে সাক্ষ্যও দেয়, তবুও তোমার ওপর আমি ঈমান আনব না।
নবী করীম (সা:) কুরাইশদের দ্বারা এভাবে প্রত্যাখ্যাত ও অস্বীকৃত হবার পরও তাদের হেদায়েতের জন্য নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যেতেন, তাদেরকে বোঝাতেন এবং চাইতেন তারা ইসলাম কবুল করুক। তিনি বলতেন, আমার তা’লীমের মধ্যেই তোমাদের সব কিছু আছে। যেসব সুবিজ্ঞ ব্যক্তি ঈমান কবুল করেছে এবং নবী করীম (সা:) প্রদত্ত শিক্ষামালা দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করেছে তারা কাফিরদের প্রার্থিত বস্তুর চেয়েও বেশী লাভবান হয়েছে।

