সর্বকালের সেরা মানব প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে জানা আমাদের সকলের প্রয়োজন। তাই এই পবিত্র রমজান মাসে আমাদের মুক্তকণ্ঠের পাঠকদের জন্যে আমাদের পক্ষ থেকে ছোট্ট এই প্রচেষ্টা, সীরাতে রাসূলে আকরাম (সা.)। আজকে থাকছে এই বিশেষ আয়োজনের প্রথম পর্ব। সম্পূর্ণ লিখাটি সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র)এর “সীরাতে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম” থেকে সংগ্রহ করে পরিমার্জিত করা হয়েছে।
জন্ম
আমাদের নবী মহানবী হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হস্তী বর্ষে বসন্ত মৌসুমে ৯ই রবিউল আওয়াল সোমবার তারিখে সুবহে সাদিকের পর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন পিতামাতার একমাত্র সন্তান। মহানবী (সা.)র জন্মের পূর্বেই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন । দাদা আবদুল মুত্তালিব নিজেও শৈশবে এতিম ছিলেন। ২৪ বছর বয়স্ক লোকান্তরিত পুত্র আবদুল্লাহর স্মৃতি এই পুত্রের জন্ম লাভের খবর পেয়েই তিনি ঘরে ছুটে আসেন এবং শিশু মহানবী (সা:)কে কা’বা ঘরে নিয়ে যান । অতঃপর শিশুর জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া কামনা করেন। জন্মের সপ্তম দিনে আকিকা করা হয় এবং এই উপলক্ষ্যে কুরাইশদের দাওয়াত করা হয়। খাবার পর আমন্ত্রিত মেহমানরা জিজ্ঞেস করল, আপনি শিশুর কি নাম রেখেছেন? উত্তরে আবদুল মুত্তালিব জানালেন, মুহাম্মদ। সকলেই পরম বিস্ময়ে বলল, আপনি আপনার খান্দানে প্রচলিত নাম বাদ দিয়ে এ নাম রাখলেন কেন? তিনি বললেন, এই জন্য রাখলাম যাতে আমার পৌত্র সারা জগতের প্রশংসার অধিকারী হয়।
স্তন্য দান
মহানবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সর্বপ্রথম তাঁর মা, অতঃপর দুই তিন দিন পর তাঁর চাচা আবু লাহাবের দাসী ছুওয়াইবা দুধ পান করান। সে সময় আরবে নেতৃস্থানীয় ও অভিজাত খান্দানের ভেতর নিয়ম ছিল দুগ্ধপোষ্য শিশুদের দেহাত অঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া। উদ্দেশ্য ছিল, শিশু বেদুঈন পল্লির উন্মুক্ত পরিবেশে বেড়ে উঠবে, তাদের ভাষার অলংকরণ আত্মস্থ করবে এবং আরবের নির্ভেজাল আরবীয় বৈশিষ্ট্য শিশুর চরিত্রে অক্ষুণ্ণ থাকবে । মহানবীর জন্মের কয়েকদিন পর হাওয়াযিন গোত্রের কতিপয় মহিলা শিশুর সন্ধানে মক্কায় আগমন করে । এঁদের মধ্যে হালিমা সা’দিয়া নামের জনৈকা মহিলা ছিলেন । সঙ্গী মহিলারা শিশু সংগ্রহে সমর্থ হলেও ঘটনাক্রমে তিনি অর্থাৎ হালিমা সা’দিয়া এতে ব্যর্থ হলেন । মহানবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা:)র মা আমিনা তাঁর হাতে প্রাণাধিক পুত্রকে তুলে দিতে চাইলেও মা হালিমা শিশুকে নিতে ইতস্তত করছিলেন। তিনি ভাবছিলেন, এই এতিম শিশু লালন-পালনের বিনিময়ে এমন কিইবা মিলবে। আবার একেবারে খালি হাতে ফিরে যেতেও তাঁর মন সায় দিচ্ছিল না। অগত্যা তিনি হযরত আমিনার প্রস্তাবে সম্মত হয়ে শিশু মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে কোলে তুলে ঘরের উদ্দেশে রওয়ানা হন। দু’বছর পর হালিমা সা’দিয়া শিশু মহানবীকে মক্কায় নিয়ে আসেন এবং তাঁকে তাঁর মার হাতে তুলে দেন।
এ সময় মক্কায় মহামারী দেখা দিয়েছিল। তাই শিশুর নিরাপত্তার স্বার্থে মা আমিনার আকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষিতে তিনি আবার তাঁকে নিজের ঘরে ফিরিয়ে আনেন। হযরত হালিমাকে রাসূলুল্লাহ (সা:) গভীরভাবে ভালোবাসতেন । হযরত হালিমার স্বামীর নাম ছিল হারিছ ইব্ন আবদিল উয্যা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়ত লাভের পর তিনি মক্কায় আগমন করেন এবং ইসলাম কবুল করেন।
অভিভাবক হিসাবে আবু তালিব
মহানবীর বয়স যখন ছয় বছর তখন তাঁর মা তাঁকে নিয়ে মদিনায়় যান । মহানবীর দাদা আবদুল মুত্তালিবের মাতৃকুল ছিল মদীনার নাজ্জার বংশ। তাঁরা সেখানেই অবস্থান করেন। এই সফরে মহানবী (সা:)র দাঈ-মা উম্মু আয়মান সাথে ছিলেন। তাঁরা এক মাস মদিনায়় অবস্থান করেন ৷ অতঃপর মক্কায় ফেরার পথে ‘আবওয়া’ নামক স্থানে মা আমেনা ইন্তেকাল করেন এবং সেখানেই তিনি সমাহিত হন। উম্মু আয়মান মহানবী (সা:)কে নিয়ে মক্কায় ফিরে আসেন ।
মাতার ইন্তেকালের পর দাদা আবদুল মুত্তালিব মহানবী (সা:)র লালন-পালনের ভার গ্রহণ করেন। তিনি সব সময় তাঁকে নিজের কাছে রাখতেন । বিরাশি বছর বয়সে তিনিও ইন্তেকাল করেন। এ সময় মহানবী (সা:)র বয়স ছিল আট বছর। দাফনের জন্য আবদুল মুত্তালিবের লাশ খাটিয়ায় ওঠানো হলে মহানবী (সা:) ও সাথে ছিলেন। সে সময় তিনি কাঁদছিলেন। আবদুল মুত্তালিব মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে মহানবী (সা:)র লালন-পালনের ভার তদীয় পুত্র আবু তালিবের হাতে তুলে দেন। আবু তালিব তাঁর আপন সন্তানের চেয়েও মহানবী (সা:)কে বেশি ভালোবাসতেন, স্নেহ করতেন । রাত্রে ঘুমাবার সময়ও কাছে নিয়ে ঘুমাতেন, কোথাও বাইরে যেতে হলে সাথে নিয়ে যেতেন।
মহানবী (সা:)র বয়স যখন দশ কিংবা বারো তখন থেকে তিনি ছাগল চরান। যে সময় তিনি রাসুল হন, সে সময় তিনি এই সহজ সরল ও আনন্দপূর্ণ কাজের কথা বলতেন। একবার তিনি সাহাবাদের সঙ্গে জঙ্গলে যান। সাহাবায়ে কেরাম (রা) গাছ থেকে কুল পেড়ে খেতে শুরু করেন। তিনি তখন বলেন, যে সব কুল খুব বেশি কালো সেগুলোই খেতে সবচেয়ে বেশি মজার। এ অভিজ্ঞতা আমার তখন যখন কৈশোরে এখানে আমি ছাগল চরাতাম।
আবু তালিব ব্যবসা করতেন। কুরাইশদের নিয়ম ছিল, বছরে তারা একবার বাণিজ্য উপলক্ষ্যে সিরিয়ায় গমন করতেন। মহানবী (সা:)র বয়স তখন বারো বছর । সে সময় চাচা আবু তালিব বাণিজ্য উপলক্ষ্যে সিরিয়া সফরের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। সফরে কষ্ট হবে ভেবে কিংবা অন্য কোন ধারণায় তিনি মহানবী (সা:)কে সাথে নিতে চাচ্ছিলেন না। কিন্তু মহানবী (সা:) চাচা আবু তালিবকে এত বেশি ভালোবাসতেন যে, চাচা সফরের উদ্দেশে রওয়ানা হতেই তিনি তাকে জড়িয়ে ধরেন। আবু তালিব প্রাণপ্রিয় ভাতিজার মনে কষ্ট দিতে চাননি । ফলে তিনি মহানবী (সা:)কে সাথে নিতে সম্মত হন ।
ফিজার যুদ্ধ ও হিলফুল ফুযূল-এ অংশ গ্রহণ
আরবে ইসলামের সূচনাকাল পর্যন্ত যুদ্ধ-বিগ্রহের যেই অব্যাহত ধারা চলে আসছিল তন্মধ্যে ফিজার যুদ্ধ ছিল সর্বাধিক বিপজ্জনক । বনূ কুরাইশ ও কায়েস গোত্রের মধ্যে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যেহেতু বনূ কুরাইশ ছিল এই যুদ্ধের অন্যতম পক্ষ, তাই মহানবী (সা:)কেউ এতে যোগদান করতে হয়। তবে তিনি কারোর ওপর হাত ওঠান নি ৷
এই অব্যাহত যুদ্ধ শত শত পরিবারকে ধ্বংস ও বরবাদ করে দিয়েছিল এবং হত্যা ও রক্তপাত তাদের মৌরসী ঐতিহ্যে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। তো অনেকের মনে এই অবস্থার সংস্কার ইচ্ছা প্রবল হয়ে ওঠে। ফিজার যুদ্ধ শেষে মানুষ যখন যে যার বাড়ি-ঘরে তখন যুবায়র ইব্ন আবদিল মুত্তালিব, যিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা ও খান্দানের নেতৃস্থানীয় পুরুষ, এই প্রস্তাব পেশ করেন। অনন্তর বনূ হাশিম, বনূ যুহরা ও বনূ তায়ম আবদুল্লাহ ইব্ন ‘জাদ’আনের ঘরে সমবেত হয়। আলোচনা অন্তে সকলে এই অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়, আমাদের মধ্যে সকলেই মজলুমের সাহায্য করবে এবং মক্কার চতুঃসীমার ভেতর কোন জালেম অত্যাচারী থাকতে পারবে না। মহানবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা:)ও এই অঙ্গীকারে শরীক ছিলেন। তিনি তাঁর নবুয়ত যুগে বলতেন, সেই অঙ্গীকারের মোকাবেলায় কেউ যদি আমাকে লাল রঙের উটও দিতে চাইত, তবুও এর বিনিময় করতাম না । আর আজও যদি কেউ সেই অঙ্গীকারের নামে আমাকে আহবান জানায় আমি সেই আহবানে সাড়া দেব ।
চাচা আবু তালিবের সঙ্গে তিনি সেই কৈশোরেই কয়েকটি বাণিজ্যিক সফরে গিয়েছিলেন এবং এ বিষয়ে সব রকমের অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন। এ সময় তাঁর উত্তম লেনদেনের খ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে গেছে। ‘আবদুল্লাহ ইবন আবিল-হামসা’ নামক একজন সাহাবী বর্ণনা করেন, নবূওত লাভের পূর্বে আমি মহানবী রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কিছু কেনা-বেচার কাজ করেছিলাম। কিছু লেনদেন হয়েছিল আর কিছুটা বাকী ছিল। আমি ওয়াদা করলাম, আমি আবার আসব। ভুলে যাবার দরুন ওয়াদা মাফিক প্রতিশ্রুত সময় ও স্থানে আমি যেতে ব্যর্থ হই। তৃতীয় দিনে স্মরণ হতেই আমি প্রতিশ্রুত স্থানে গিয়ে দেখতে পাই তিনি আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। কিন্তু এতদ্সত্তেও তাঁর চেহারায় এতটুকু বিরক্তি কিংবা অসন্তোষের চিহ্ন ছিল না। কেবল এতটুকু বলেছিলেন, তুমি আমাকে কষ্ট দিয়েছ। আজ তিন দিন যাবত আমি এখানে আছি ।
হযরত খাদীজা (রা)-এর সঙ্গে বিয়ে
মক্কায় তখন খাদীজা (রা) নামে অভিজাত বংশীয় এক বিরাট ধনবতী মহিলা বাস করতেন । তাঁর বিপুল অর্থ ব্যবসায় বিনিয়োগ করতেন। মহানবী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তম স্বভাব ও গুণাবলীর কথা শ্রবণ এবং তাঁর সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ও আমানতদারী সম্পর্কে জেনে তিনি নিজেই তাঁর টাকা-পয়সা নিয়ে ব্যবসা করার জন্য আবেদন করেন। মহানবী (সা:) রাজি হয়ে তাঁর মালমাত্তা নিয়ে বাণিজ্যিক সফরে রওয়ানা হন। এতে প্রচুর মুনাফা হয়। হযরত খাদীজা (রা)-এর গোলাম মায়সারাহ ছিলেন এই সফরে মহানবী (সা:)এর সফরসঙ্গী। সফরে তিনি মহানবী (সা:)র মাঝে যেসব গুণ ও মর্যাদামণ্ডিত বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেন তা হযরত খাদীজা (রা)-এর কাছে বর্ণনা করেন। এসব গুণাবলীর কথা শ্রবণের পর তিনি মহানবী (সা:)র প্রতি আকৃষ্টা হন এবং নিজ থেকেই তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান । প্রস্তাব অনুমোদন লাভ করে এবং যথানিয়মে এই বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। অথচ এর আগে বড় বড় কুরাইশ নেতা বিয়ের প্রস্তাব পাঠালে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
কা’বার পুনঃনির্মাণ ও এক বিরাট ফেতনার অবসান এ সময় মানুষের মনে মহানবী (সা:)এর সততা ও আমানতদারীর প্রভাব এতটা ছিল যে, লোকে তাঁর নাম ধরে ডাকতো না, বরং ‘আস-সাদিক’ কিংবা ‘আল-আমীন’ বলে ডাকতো। মহানবী (সা:)র বয়স এ ৩৫ সময় বছর । প্লাবনের কারণে এ সময় কা’বার দেওয়ালে ফাটল দেখা দেয়। ফলে সংস্কারের লক্ষ্যে কুরাইশরা কা’বার পুনঃনির্মাণে হাত দেয় । এতে দল-মত-নির্বিশেষে সকলে অংশ গ্রহণ করে। কিন্তু ঝামেলা বাঁধল হাজরে আসওয়াদ নামক পবিত্র কালো পাথরটিকে যথাস্থানে স্থাপন করা নিয়ে। সকলেরই দাবি এ কাজ সেই করবে। এ দাবিতে কেউ কাউকে এতটুকু ছাড় দিতে রাজী নয়। শেষমেষ অবস্থা প্রকাশ্য সংঘর্ষের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে দাঁড়ালোল ।
সেকালে আরবে এক নিয়ম ছিল, কেউ যখন কোন কিছু হাসিলের লক্ষ্যে জান বিলিয়ে দেবার কসম খেত তখন রক্তভর্তি পেয়ালা এনে হাজির করা হতো। এরপর সকলে সেই পেয়ালায় হাত ডুবিয়ে কসম খেত। এ সময় এই নিয়মও পালিত হয়। এ অবস্থায় কেটে যায় চার দিন। পঞ্চম দিনে আবু উমাইয়া ইবনে মুগীরা নামক একজন বর্ষীয়ান কুরাইশ নেতা পরামর্শ দিলেন, দেখো, তোমরা এ নিয়ে লড়াই-ঝগড়া করো না। তোমরা বরং এক কাজ কর। আগামীকাল ভোরে যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম হারাম শরিফে প্রবেশ করবে তোমরা তাকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মেনে নাও। এরপর তিনি যেই ফয়সালা দেবেন তোমরা তাই মেনে নাও। সকলেই তার পরামর্শ মেনে নিল। আল্লাহর কী কুদরত দেখুন! পরদিন সকালে মহানবী (সা:)ই কা’বা শরিফে সর্বপ্রথম প্রবেশ করলেন । মহানবী (সা.) কে দেখতেই সকলে সমস্বরে চিৎকার করে উঠল, এই যে, আমাদের আল-আমীন এসে গেছেন! আমরা তাঁর ফয়সালা মেনে নিতে রাজী আছি। মহানবী (সা:) তাঁর উপস্থিত বুদ্ধি ও গভীর প্রজ্ঞার সাহায্যে এমন এক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন যা তারা সকলেই মেনে নিল । তিনি একটি চাদর বিছিয়ে তার ওপর কাল পাথরটিকে রাখলেন। এরপর তিনি উপস্থিত সকল গোত্র প্রধানকে ডাকলেন এবং চাদরের প্রান্তদেশ ধরে ওঠাতে বললেন। এভাবে সকলে মিলে পাথরটিকে কা’বার পার্শ্বে নিয়ে চলল। অতঃপর তিনি পাথরটিকে স্বহস্তে উঠিয়ে যথাস্থানে স্থাপন করলেন । মহানবী (সা:)র এই সংক্ষিপ্ত সুন্দর ব্যবস্থাপনায় আরব কুরাইশরাা একটি রক্তক্ষয়ী আন্তঃযুদ্ধের হাত থেকে বেঁচে গেল। নইলে যেই আরব সর্বাগ্রে পশু পালের পানি পান নিয়ে, ঘোড় দৌড়, কাব্য-কবিতায় এক গোত্র কর্তৃক অন্য গোত্রের স্তুতি কিংবা নিন্দা বর্ণনা নিয়ে, এমন কি সামান্য কথা নিয়ে যুদ্ধ শুরু করত যা নিয়ে অনেক সময় বছরের পর বছর গড়িয়ে যেত। এই ঘটনার এরূপ সুন্দর নিষ্পত্তি না হলে একে কেন্দ্র করেও অনুরূপ কোন কিছু ঘটা কিছুমাত্র বিচিত্র ছিল না ।
আসমানী প্রশিক্ষণ
শৈশব, কৈশোর তথা যৌবনেও যখন তিনি নবী হননি কিংবা রিসালত দ্বারা তাঁকে ভূষিত করা হয়নি সে সময়ও তিনি শিরক ও কুফর থেকে পরহেয করেছেন, এড়িয়ে চলেছেন । একবার তাঁর সামনে কুরাইশরা খাবার এনে রাখল । খাবারগুলো ছিল মূর্তির উদ্দেশে উৎসর্গীকৃত প্রসাদ। এর ভেতর যে গোশত ছিল তা ছিল মূর্তির নামে উৎসর্গীকৃত ও জবাইকৃত পশুর গোস্ত। তিনি এ খাবার খেতে অস্বীকার করেন। তিনি নবূওত লাভের পূর্ব থেকেই মূর্তি পূজার বিরুদ্ধে ও এর অনিষ্টসম্পর্কে কথা বলতেন এবং যেসব লোকের ওপর তাঁর আস্থা ছিল তিনি তাদেরকে এর থেকে নিষেধ করতেন।
রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে যুগে জন্মগ্রহণ করেন সেই যুগে মক্কা ছিল মূর্তিপূজার বিরাট কেন্দ্র। খোদ কা’বা শরীফের ভেতরেই ৩৬০টি মূর্তি ছিল। রাসুল (সা:)এর খান্দানের বড় বৈশিষ্ট্যই ছিল এই যে, তারাই ছিল এই ঘরের মুতাওয়াল্লী ও চাবিবাহক । রাসুল আকরাম (সা:) কখনো মূর্তির সামনে মাথা নত করেন নি । এছাড়া জাহিলী নানাবিধ রসম-রেওয়াজেও তিনি কখনো শরীক হননি। কুরাইশরা এরই ওপর ভিত্তি করে যে, তাদেরকে সাধারণ লোকদের থেকে প্রতিটি বিষয়ে বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে হবে, নিয়ম করেছিল, হজ্জের দিনগুলোতে আরাফাত ময়দানে যোগদান তাদের জন্য জরুরী নয়। আর যারা মক্কার বাইরে থেকে হজ্জ করতে আসবে তারা কুরাইশদের পোশাক পরিধান করবে, নইলে উলঙ্গ হয়ে কা’বা তওয়াফ করবে। আর এরই ওপর ভিত্তি করে উলঙ্গ হয়ে কা’বা তওয়াফ করার সাধারণ রেওয়াজ চালু হয়ে যায় । কিন্তু মহানবী (সা:) এসব ব্যাপারে কখনো সমর্থন কিংবা সহযোগিতা করেন নি।
আরবে রূপকথা বর্ণনার সাধারণ রেওয়াজ ছিল। রাতের বেলা তারা সমস্ত কাজ-কাম থেকে মুক্ত হয়ে কোন এক জায়গায় সমবেত হতো। এদের মধ্যে যে এ বিষয়ে পারদর্শী ও অভিজ্ঞ হতো সে রূপকথা বলা শুরু করত। লোকে খুবই আগ্রহ ভরে এসব শুনত আর রাতের পর রাত কাটিয়ে দিত। শৈশবে একবার তিনি এ ধরনের এক আসরে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। পথিমধ্যে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। কৌতূহলবশে তা দেখার জন্য তিনি দাঁড়িয়ে যান এবং এক সময় সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েন। যখন ঘুম ভাঙল তখন সকাল হয়ে গেছে! আরেক বারও এমনটিই ঘটেছিল । ফলে নবূওত-পূর্ব চল্লিশ বছরের জীবনে দু’বারই এ ধরনের ইচ্ছে তাঁর মনে জেগেছিল। কিন্তু আল্লাহ পাকের অসীম মেহেরবানী তাঁকে দু’বারই এর থেকে হেফাজত করেছিল। কেননা মহানবী (সা:)র মহান সত্তা এসবের ঊর্ধ্বে ছিল ।

