চট্টগ্রামের হাটহাজারীর চৌধুরীহাট নার্সিংহোমে ইনজেকশন দেওয়ার কিছুক্ষণ পর পাঁচ মাসের গর্ভের সন্তান মৃত প্রসবের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ভুক্তভোগী পরিবার। শুধু তাই নয়, ঘটনা নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিককে নার্সিংহোম থেকে বের হয়ে যেতে হুমকি ও কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর)দিবাগত রাতের এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চৌধুরীহাট এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, পেটব্যথা ও প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়ার সমস্যায় পঙ্কি দাসকে প্রথমে চিকিৎসকের পরামর্শে চট্টগ্রামের পপুলার হাসপাতালে জরুরি আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো হয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, আল্ট্রাসনোগ্রামের রিপোর্ট দেখে গর্ভের সন্তান সুস্থ রয়েছে বলে জানান চৌধুরীহাট নার্সিংহোমের চিকিৎসক। পরে তাকে বেড রেস্টে থাকার পাশাপাশি প্রতি বৃহস্পতিবার ইনজেকশন নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
পরিবারের অভিযোগ, ওই দিন ইনজেকশন নেওয়ার পর বাসায় ফেরার ২০ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যেই পঙ্কি দাসের ব্যথা শুরু হয়। পরে রাত আড়াইটার দিকে তাকে আবার চৌধুরীহাট নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া হয়।
স্বজনদের দাবি, সেখানে ডিউটি চিকিৎসক শারমিন পরীক্ষা করে প্রস্রাবের ইনফেকশনের কারণে ব্যথা হচ্ছে বলে জানান। এরপর কোমরে একটি ইনজেকশন দেওয়া হয়।পরিবারের ভাষ্য, ইনজেকশন দেওয়ার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই পঙ্কি দাস নিস্তেজ হয়ে পড়েন। এরপর রক্তপাত শুরু হয় এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই বেডে পাঁচ মাসের গর্ভের সন্তান প্রসব হয়। তবে সন্তানটি মৃত ছিল বলে দাবি পরিবারের।
ঘটনার পর দ্রুত তাদের রিলিজ করে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন স্বজনরা। পঙ্কি দাসের ননদের অভিযোগ, ইনজেকশনের নাম লেখা প্রেসক্রিপশনটি তাদের হাতে না দিয়েই রিলিজ দেওয়া হয়। এ ঘটনায় তাদের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে বলে জানান তিনি।
পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ঘটনার পর অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসা বা ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সন্তান হারানো পরিবার এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা বা গাফিলতি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
ঘটনার এখানেই শেষ নয়। শুক্রবার এ ঘটনা নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে এক সাংবাদিককে হুমকি ও কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।অভিযোগ অনুযায়ী, মুমিন নামে এক ব্যক্তি সাংবাদিককে নার্সিংহোম থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। এ সময় তিনি নিজেকে হাটহাজারী উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এবং প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এমপির কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন বলে অভিযোগ।
সাংবাদিককে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘এখানে নিউজ করতে হলে মীর হেলাল নিজে এসে ভিডিও করবেন।’
এই বক্তব্যের মাধ্যমে সাংবাদিককে ভয় দেখিয়ে সংবাদ সংগ্রহ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ সেই সাংবাদিকের।তবে মুমিনের দেওয়া রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।
হাটহাজারী উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ফোরকান চৌধুরী জানান, মুমিন ওই সংগঠনের সভাপতি নন।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মুমিন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং চৌধুরীহাট নার্সিংহোমের শেয়ারহোল্ডারদের একজন। ফলে নার্সিংহোমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সংবাদ সংগ্রহের সময় তার এমন ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার সময় মুমিন প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এমপির কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এমপির রাজনৈতিক সচিব আকবর আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখছেন।
ঘটনাটি অবহিত হওয়ার পর হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তাপস কান্তি মজুমদার একজন স্বাস্থ্য সহকারীকে সেখানে পাঠানোর কথা নিশ্চিত করেছেন।তিনি জানান, লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে চৌধুরীহাট নার্সিংহোমের ম্যানেজার মোহাম্মদ আব্দুস সালামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অসুস্থ থাকায় ঘটনাটি সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানেন না। তবে কারও দোষ পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও সংশ্লিষ্টরা মিটিংয়ে থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
একদিকে পাঁচ মাসের গর্ভের সন্তান মৃত প্রসবের অভিযোগ, অন্যদিকে ইনজেকশন দেওয়ার পর রোগীর অবস্থার অবনতির দাবি এবং চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
এর সঙ্গে সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিককে হুমকি ও কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইনজেকশনের পর কেন রোগীর অবস্থার অবনতি হলো, মৃত সন্তান প্রসবের প্রকৃত কারণ কী, চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না এবং সাংবাদিককে কেন সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেওয়া হলো—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

